বালির দেশের দুগ্গা মা Balir Dasher Dugga

কলমে : সৌরভ চট্টোপাধ্যায়। না ,কোনো সমুদ্র উপকূলের বালির তটভূমির কথা বলছি না, তবে পৃথিবীতে মানুষ জন্মানোর আগে তো বঙ্গোপসাগর পাহাড় ছুঁয়ে ফিসফাস করতো। ক্রমশ পিছু হটতে গিয়ে রেখে গেছে কত বালি, একদিকে হুগলি নদী, অন্যদিকে রূপনারায়ণ, মাঝে দামোদর ও তার শাখা কৌশিকী কত পলি এনেই না জমা করেছে সেই বালির ওপর। আজ সেই পরিণত বদ্বীপ এর ছোট্ট এক এলাকার অকাল বোধনের কথা বলবো।

এককালের ভূরিশ্রেষ্ঠ বা ভুরসুট পরগণা, মোগল সম্রাট আকবরের সময়কার বলিয়া পরগনা হলো অধুনা হাওড়া জেলার এক অতি বর্ধিষ্ণু জনপদ। এই জনপদের একটি অংশ এখন বারো বেলে নামেই পরিচিত। জগৎবল্লভপুরের বারোটি গ্রাম, যার মধ্যে পাঁচটি গ্রাম এর সাথে বলিয়া শব্দটি যুক্ত যেমন নিজবালিয়া, গড়বালিয়া, নিমাবালিয়া, যমুনাবালিয়া ও বাদেবালিয়া। স্পষ্টভাবেই মাটি খুঁড়লে  পাঁচ থেকে পঞ্চাশ ফুট গভীরে বালির স্তর দৃশ্যমান।

এহেন বালির দেশে এক বৈশাখী সীতানবমীর দুপুরে পাঁতিহাল স্টেশন এ দাঁড়িয়ে থাকলে যেকোনো মানুষ  অবাক হয়ে যাবেন, কাতারে কাতারে মানুষ টোটো, অটো, ভুটভুটি করে ছুটে চলেন বালিয়ার অলিখিত রাজধানী  নিজবালিয়ার সিংহবাহিনী মন্দির প্রাঙ্গনে। এলাকার প্রাচীন রাজার কুলদেবী তথা বর্ধমান রাজ এর প্রতিষ্ঠিত মন্দিরে প্রায় চারশো বছরের পুরোনো দেবী সিংহবাহিনী ই এখানে মা দূর্গা, তবে অসুর বিহীন, অভয় দায়িনী, অষ্টভুজা। গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহে অনুষ্ঠিত বাৎসরিক সীতানবমীর হোম ও মহাপূজাই এখানকার দুর্গোৎসব।

এই বাৎসরিক পূজা ও অন্নকূট মহোৎসব, সেই সঙ্গে সপ্তাহব্যাপী সংগঠিত নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিচালনা ভার থাকে পূজাকমিটি র ওপর, যদিও দেবীর নিত্য সেবার জন্য রয়েছেন সেবায়েতবর্গ। বাৎসরিক এই মহাপূজা আশি বছরেরও বেশি পুরোনো, এলাকায় উদ্ভূত রোগের মড়ক এ বহু মানুষের মৃত্যু ও ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার বিশ্বাসেই এই বাৎসরিক অনুষ্ঠানের সূচনা হয়।

সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রাচীন পরম্পরা মেনে সিংহবাহিনীরূপে প্রকাশিত জগৎজননী মায়ের সীতানবমীর ওই আরাধনা কেই এলাকার মানুষ দুর্গাপুজোর স্বীকৃতি দেন, নতুন জামা পরে আনন্দে মাতেন, দূরদূরান্তে কর্মরত ব্যক্তিরা বাড়ি ফিরে আসেন, মেলা হয়, মন ভরে যায়। তাই নামের সাথে বালিয়া যুক্ত উল্লেখিত কেন্দ্রীয় পাঁচটি গ্রামে শারদীয়া দুর্গাপুজো আজও অনুষ্ঠিত হয়না।

শারদীয়া দুর্গাপুজোর অষ্টমী , নবমীতে এলাকার মানুষ মন্দিরে মায়ের কাছেই অঞ্জলি দেন উপাচার মেনে। অবশ্য বলিয়া পরগনার অন্যান্য গ্রামে দুর্গোৎসব সংগঠিত হয়।  তবে সমগ্র এলাকায় শ্যামা কালী পূজার খুব নামডাক, বড়ো মণ্ডপ, প্রতিমা আর আলোকসজ্জায় দু তিনটে দিন ক্লাব গুলো মেতে ওঠে।

অনেক প্রবাসী যাঁরা সিংহবাহিনী মহাপূজায়  সেই অকাল বোধনে ফেরার ফুরসৎ করতে পারেন না, তাঁদের কালী পুজোতে নিজভূমে সপ্তাহখানেক এর জন্য ফেরা এক প্রকার নিশ্চিত ,মনোরঞ্জনে হিমের ছোঁয়া গায়ে মেখে দুর্গাপুজোর আগেথেকেই প্রস্তুতি সারতে থাকেন সোনালী শিবির, নবপ্রভাত সংঘ, শতদল ক্লাব, নবোদয় সংঘ,ভাইভাই সংঘ ও আরো নানা সংঘের সদস্যরা।

Leave a Comment

Enable Notifications OK No thanks